টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের লামা উপজেলায় নজিরবিহীন দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা ও পাহাড়ধসে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে পুরো উপজেলা। সাম্প্রতিক এই দুর্যোগে একদিকে যেমন বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, অন্যদিকে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে জনপদে।
পাঁচজনের মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি
লামার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া এলাকায় পাহাড়ধসের পৃথক ঘটনায় দুটি পরিবারের পাঁচজন সদস্যের করুণ মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করে।
প্রাথমিক তথ্যমতে, লামা পৌরসভাসহ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিন হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং ৫০টির বেশি সেতু ও কালভার্ট ভেঙে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বন্যার পানি জমে থাকায় উপজেলাজুড়ে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড: স্থানীয়দের অভিযোগ
দুর্যোগের পেছনে কেবল প্রাকৃতিক কারণকে দায়ী করতে নারাজ স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশকর্মীরা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডই এই দুর্যোগের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে:
অবৈধ ইটভাটা: উপজেলায় প্রায় ৩৬টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে, যেগুলোর কোনোটিরই পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই।
পাহাড় নিধন: বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।
অবৈধ বালু উত্তোলন: নদী ও ঝিরি থেকে যন্ত্রের সাহায্যে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে মাটির গঠন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বন উজাড় ও তামাক চাষ: বনভূমি উজাড় করে হাজার হাজার একর জমিতে তামাক চাষ করার ফলে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক মতামত
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টি দুর্যোগের কারণ হলেও, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং বন উজাড়ের ফলে পাহাড়গুলো আজ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে অতিবৃষ্টির সময় ভূমিধসের মতো প্রাণঘাতী ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেড়ে গেছে।
লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস নিরলস কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও সুপারিশ
ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞরা নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন:
১. পরিবেশ আইন লঙ্ঘনকারী অবৈধ ইটভাটা ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনা।
২. একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করা।
৩. পাহাড় পুনর্বনায়ন ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ।
৪. ভেঙে পড়া গ্রামীণ অবকাঠামো দ্রুত পুনর্নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু ত্রাণ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। পাহাড় ও প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্য এখনই কঠোর প্রশাসনিক উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে লামাকে।