
ওরাল সেক্সের মাধ্যমে নারী যৌনাঙ্গে সংক্রমণ ঘটে ‘ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজিনোসিস’ বা ‘বিভি’ নামে রোগ হতে পারে বলে এক গবেষণায় জানা যাচ্ছে।
প্লস বায়োলজি নামে এক জার্নালে এই গবেষণার বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে এবং এতে বলা হচ্ছে যে ওরাল সেক্সের মাধ্যমে নারী দেহে এই রোগ বাসা বাঁধে।
তবে বিভি কোন সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ বা যৌনরোগ নয়।
নারীর ভ্যাজাইনা বা যোনিতে সাধারণ যেসব ব্যাকটেরিয়া থাকে, সেখানে কোন ভারসাম্যের অভাব দেখা গেলে বিভি হতে পারে।
যারা এই রোগের শিকার হন, তাদের দেহে বিভি’র কোন উপসর্গ নাও দেখা যেতে পারে। তবে তাদের যোনি থেকে দুর্গন্ধযুক্ত রস নিঃসৃত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, কনডম ব্যবহারে অনিহার কারণে গনোরিয়া রোগ ছড়িয়ে পড়ছে এবং ‘ওরাল সেক্স’ এর কারণে গনোরিয়ার জীবাণুকে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ভয়ঙ্কর মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে।
সংস্থাটি আরো বলছে, এমন পরিস্থিতিতে কেউ যদি গনোরিয়ায় আক্রান্ত হয় তাহলে তার চিকিৎসা করাটা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠেছে ‘অসম্ভব’।
ডাব্লিউএইচও’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌন সংসর্গের মাধ্যমে ছড়ানো এই রোগের জীবাণু অ্যান্টোবায়োটিকের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর নতুন অ্যান্টোবায়োটিক উদ্ভাবনে খুব বেশি সাফল্য এখনও না আসায় পরিস্থিতি আরও বেশি নাজুক হয়ে পড়েছে।
বিশ্বে প্রায় সাত কোটি ৮০ লাখ মানুষ প্রতি বছর এ রোগ সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন, যা অনেকের ক্ষেত্রে সন্তান জন্মদানে অক্ষমতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও অন্তত ৭৭টি দেশের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখেছে, গনোরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠার প্রবণতা কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
সংস্থাটির বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তিওডোরা উয়ি বলছেন, জাপান, ফ্রান্স ও স্পেনে অন্তত তিনটি ঘটনা পাওয়া গেছে যেখানে গনোরিয়া পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব নয়।
“গনোরিয়ার জীবাণুকে খুবই স্মার্ট বলতে হবে। যতবার আপনি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে এর চিকিৎসা করতে চাইবেন, ততবারই তা প্রতিরোধের ক্ষমতা অর্জন করবে।”- বলছেন তিওডোরা উয়ি।
আরও চিন্তার বিষয় হলো, গরিব দেশগুলোতে গনোরিয়া সংক্রমণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে; যেখানে এই জীবাণু কতটা ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, সেই তথ্য পাওয়া কঠিন।
‘ওরাল সেক্স’ গনোরিয়ার জীবাণুকে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ভয়ঙ্কর মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
‘ওরাল সেক্স’ কি এখন সাধারণ কোনো বিষয় হয়ে উঠেছে?
বিশ্বের মানুষ এখন আগের তুলনায় ‘ওরাল সেক্স’ – এ বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে -এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় কারণ এ নিয়ে নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই।
তবে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে বুঝা যায় যে দেশ দুটোতে এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। বছরের পর বছর ধরে এমনটা হয়ে আসছে, এমনকি টিন-এজাররাও ‘ওরাল সেক্স’করছে।
যুক্তরাজ্যের মানুষের ‘সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার ও লাইফস্টাইল’ নিয়ে জাতীয় একটি জরিপ চালানো হয় ১৯৯০-৯১ সালের মধ্যে। সেই জরিপে দেখা যায় ৬৯.৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৬৫.৬ শতাংশ নারী প্রতি বছর তার বিপরীত লিঙ্গে কাছ থেকে ‘ওরাল সেক্স’ গ্রহণ করে বা দেয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাতীয় জরিপে গবেষকরা দেখেছেন, ১৫-২৪ বছর বয়সীদের দুই-তৃতীয়াংশই ‘ওরাল সেক্স’ এ অভ্যস্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেশন সার্ভের অংশ হিসেবেই এই গবেষণা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো পুরুষ যদি পাঁচ বা ততোধিক নারীর সঙ্গে ওরাল সেক্স করেন, তাহলে তাঁর হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা থাকে। এই ভাইরাসটি এইচপিভি নামে পরিচিত। আর এই ভাইরাসের থেকেই ওই ব্যক্তির ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া ওই পুরুষ যদি ধূমপায়ী হন, তাহলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। মাত্র দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ গলার মধ্যভাগের ক্যানসার সারিয়ে তুলতে পারেন। তবে নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় অনেক কম।
গবেষকেরা বলছেন, ২০২০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সার্ভিক্যাল ক্যানসারের চেয়ে ওরাল সেক্সের কারণে হওয়া মাথা ও কাঁধের ক্যানসার খুব বেশি প্রকট হয়ে উঠবে। শতাধিক এইচপিভি ভাইরাস রয়েছে। তবে বিপজ্জনক হচ্ছে এইচপিভি ১৬ ও এইচপিভি ১৮ ভাইরাস। এ দুটোর কারণে সার্ভিক্যাল ক্যানসার হয়। আর এইচপিভি ১৬ থেকে অরোফারিঙ্গাল ক্যানসার বা গলার মধ্যভাগের ক্যানসার ছড়াতে পারে।
গবেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহযোগী অধ্যাপক আম্বার ডি’সুজা বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষ ওরাল সেক্সে অভ্যস্ত। নারীদের ক্যানসার সৃষ্টিকারী এইচপিভি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক কম। পুরুষেরা বেশি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন। আর কোনো পুরুষ যদি ধূমপায়ী হন এবং জীবনে পাঁচজনের বেশি নারীর সঙ্গে ওরাল সেক্স করেন, তাহলে এইচপিভি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মাথা, গলা, ঘাড় ও মুখের ক্যানসারে তাঁর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়।’
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেশন সার্ভের প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণায় ২০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী ১৩ হাজার ৮৯ নারী-পুরুষের এইচপিভি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, নারীদের তুলনায় পুরুষদের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। যা থেকে মাথা কাঁধের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি অনেক।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, যে নারীর জীবনে ওরাল সেক্সের সঙ্গী নেই, তাঁর এইচপিভি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার তেমন কোনো ঝুঁকি নেই। আর ধূমপায়ী নন, এমন নারীদের মধ্যে মাত্র দশমিক ৫ শতাংশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। তবে যেসব নারীর দুই বা ততোধিক ওরাল সেক্সের সঙ্গী আছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও এইচপিভিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পুরুষদের ক্ষেত্রেও একইভাবে এই প্রবণতা রয়েছে। যারা পাঁচ বা ততোধিক নারীর সঙ্গে ওরাল সেক্সে অভ্যস্ত এবং ধূমপায়ী, তাঁদের ১৫ শতাংশের এইচপিভি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
এই গবেষণার আরেক গবেষক ও জনস হপকিন্সের অটোলারিঙ্গোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ক্যারোল ফাখরি বলেন, ‘অরোফারিঙ্গাল ক্যানসার শনাক্ত করার জন্য বর্তমানে তেমন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা নেই। এই ক্যানসার সচরাচর হয় না। আর সুস্থ মানুষের এই পরীক্ষা করাটাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। কারণ, পরীক্ষায় ভুল ফলও আসতে পারে, যা মানুষের চিন্তা অযথাই বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।