বাংলাদেশের যাতায়াত, জলবিদ্যুৎ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নদীপথের ভূমিকা

বাংলাদেশের যাতায়াত, জলবিদ্যুৎ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নদীপথের ভূমিকা

ভূমিকা : নদীমাতৃক বাংলাদেশ এক সময় সারা বিশ্বে পরিচিত ছিল । বর্তমানে উজানে প্রতিবেশি দেশ ভারত নদীতে বাঁধ দেয়ার ফলে বাংলাদেশের নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে নৌপরিবহন ব্যবস্থা সমস্যাগ্রস্ত হয়েছে। তথাপি এদেশে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নদীপথের ভূমিকা এখনও কম নয়।

বাংলাদেশের যাতায়াত, জলবিদ্যুৎ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নদীপথের ভূমিকা

নদীপথের ভূমিকা : বাংলাদেশের যাতায়াত ব্যবস্থা, জলবিদ্যুৎ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

যাতায়াতে নৌপথের ভূমিকা

যাতায়াত : নদীমাতৃক দেশে যাতায়াত ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নদীগুলোই বহন করছে। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, কর্ণফুলী, সুরমা, কুশিয়ারা, মাতামুহুরী, আত্রাই, মধুমতী,গড়াই ইত্যাদি। নদী যাত্রী পরিবহন সেবায় বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে থাকে। নদী পথকেই সকলে ব্যস্ততম পথ বলে বিবেচনা করে থাকে। 

এ দেশে নদীপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৮৩৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩৮৬৫ কিলোমিটার বছরের সব সময় নৌ চলাচল করে থাকে। বাংলাদেশে নদীপথে নৌকা, লঞ্চ, ট্রলার, স্টিমার, নৌট্রাক ইত্যাদি পরিবহনে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে। দেশে সরকারি এবং বেসরকারি বেশ কিছু সংস্থা এ সব পরিবহনের যাতায়াতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। 

অভ্যন্তরণীয় নৌপরিবহন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। ১৯৫৮ সালে অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ তৈরি করা হয়েছে। সংক্ষেপে এটিকে আই ডব্লিউ টি এ বলা হয়। জনস্বার্থে এই সংস্থা নানা ধরনের যাত্রীবাহী জলযানের ব্যবস্থা করে থাকে। নদীপথে কিছু সংরক্ষণ খরচ ছাড়া তেমন কোনো নির্মাণ না থাকায় নদীপথে যাতায়াত খরচও অপেক্ষাকৃত কম।

বাংলাদেশের জলবিদ্যুৎ ব্যবস্থা

জলবিদ্যুৎ : নদী ও জলপ্রপাতের পানির বেগ ব্যবহার করে টার্বাইন যন্ত্রের সাহায্যে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় তাকে জলবিদ্যুৎ বলা হয়। এটি নবায়নযোগ্য শক্তি সম্পদ।বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই নামক স্থানে কর্ণফুলী নদীতে নদীর গতিপথে বাঁধ দিয়ে পাকিস্তান আমলে প্রথম জল বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা হয়। সবচেয়ে কম খরচে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। বর্তমান বিশ্বে তেল, গ্যাস বা পারমাণবিক চুল্লি ব্যবহারের মাধ্যমে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় তার উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। সেই তুলনায় জল বিদ্যুতের খরচ অনেক কম। সে কারণে দেশের নদীর পানি সম্পদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য লাভজনক। 

তবে যে ধরনের পাহাড়ি নদী থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, সে রকম পাহাড় ও নদী দেশে বেশি নেই । ফলে বাংলাদেশে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ কম।

ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নৌপথের ভূমিকা

বাণিজ্য : বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ নৌপথে দেশের মোট বাণিজ্যিক মালামালের ৭৫ শতাংশ আনা-নেওয়া করা হয়। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নদীপথের বাণিজ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। এক সময় আমাদের তেমন কোনো জাহাজ ছিল না। এখন বহুমুখী পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে প্রায় সব কটি নদীপথেই সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে লক্ষ লক্ষ টন মালামাল পরিবহন করা হয়ে থাকে। ফলে সকল প্রকার অস্থিতিশীলতার মধ্যেও নির্বিঘ্নে জাহাজ ও নৌযান যোগে পণ্য পরিবহন করা যায়। বর্ষাকলে বেশির ভাগ পণ্যই নৌপথে পরিবহন করা হয়। তবে শুষ্ক মৌসুমে নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ার কারণে এখন কোনো কোনো নদীতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে আসছে। দেশের কৃষি, শিল্প ও মৎস্য সম্পদের বিকাশ ঘটাতে নৌ পরিবহনের কোনো বিকল্প নেই। এর জন্যে সরকারসহ সকল সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে বাংলাদেশের নৌ বাণিজ্যকে গতিশীল করার জন্যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। তা হলে বাংলাদেশের নদী সর্বোচ্চ ব্যবহার ঘটিয়ে বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হবে।

উপসংহার : নদীপথে যাতায়াত অত্যন্ত সুলভ এবং আনন্দমুখর। নদীপথের ভ্রমণ অত্যন্ত চিত্তাকর্ষণীয়। এদেশের এক সময় সকল প্রকার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে নদীপথের একক আধিপত্য ছিল। পরবর্তীতে রেলপথ এবং সড়কপথের ভূমিকা অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। বর্তমানে নদীপথের যাতায়াত সমস্যাগ্রস্ত হওয়ায় সড়কপথের গুরুত্ব অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top